জাতীয় পতাকার মর্যাদাপূর্ণ অবসর যেভাবে করবেন
আমাদের জাতীয় পতাকা কেবল একখণ্ড কাপড় নয়; এটি আমাদের ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, ৪ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ প্রতীক। লাল এবং সবুজের এই মেলবন্ধন দেশের গৌরব ও মানচিত্র বহন করে। তবে স্বাভাবিক কারণেই রোদ, বৃষ্টি বা দীর্ঘদিনের ব্যবহারে জাতীয় পতাকা পুরোনো, জীর্ণ, বিবর্ণ কিংবা ছিঁড়ে যেতে পারে। অনেক সময়ে জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে বা বিভিন্ন সমাবেশে সাময়িকভাবে পতাকা ব্যবহার করি, যা পরবর্তীতে আর প্রয়োজন পড়ে না। ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়লে সেই পতাকাকে যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া কিংবা সাধারণ বর্জ্যের সাথে ফেলে দেওয়া জাতীয় পতাকার ঘোর অবমাননা।
বাংলাদেশের 'জাতীয় পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২' (People's Republic of Bangladesh Flag Rules, 1972) এবং প্রচলিত শিষ্টাচার অনুযায়ী জীর্ণ বা ব্যবহারে অনুপযোগী পতাকার বিনাশ ও সম্মানজনক অবসরের নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
জাতীয় পতাকার অবমাননা হিসেবে গণ্য কাজসমূহ
১. শারীরিক বা স্পর্শজনিত অবমাননা
- মাটি বা পানি স্পর্শ করা: পতাকা টাঙানো বা বহনের সময় তা যেন কোনোভাবেই মাটি, মেঝে, পানি বা নিচের কোনো বস্তুকে স্পর্শ না করে।
- পায়ের নিচে পড়া বা মাড়ানো: পতাকাকে দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছে করে পদদলিত করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
- ঝুলিয়ে বা সমান্তরালে বহন করা: মিছিলে বা শোভাযাত্রায় পতাকাকে সমতল/আনুভূমিকভাবে প্রসারিত করে বহন করা যাবে না; এটি সর্বদা উঁচুতে ও মুক্তভাবে উড্ডীয়মান রাখতে হবে।
২. বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত কাজে অপব্যবহার
- ট্রেডমার্ক বা ডিজাইনে ব্যবহার: সরকারের লিখিত অনুমতি ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, কোনো পণ্য, লোগো, পেটেন্ট বা বিজ্ঞাপনে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
- পোশাক বা কভার হিসেবে ব্যবহার: কোনো টেবিল, বেদী, যানবাহন (গাড়ি, নৌকা, উড়োজাহাজ) বা ঘরের আসবাবপত্রের কভার/আচ্ছাদন হিসেবে পতাকা ব্যবহার করা যাবে না।
- পণ্য বহনে ব্যবহার: কোনো কিছু গ্রহণ, রাখা, বহন বা প্যাকেট করার কাজে জাতীয় পতাকাকে থলে বা পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৩. পতাকার ওপর কোনো কিছু লেখা বা আঁকা
জাতীয় পতাকার ওপর যেকোনো ধরনের লেখালেখি করা, কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহার করা, কোনো স্লোগান বা নাম লেখা, ছবি আঁকা, স্বাক্ষর নেওয়া বা প্রতীক যুক্ত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৪. ভুল নিয়মে প্রদর্শন ও উত্তোলন
অগৌরবজনকভাবে টানানো: পতাকা এমন কোনো স্থানে বা পদ্ধতিতে টাঙানো যাবে না, যাতে এটি সহজে ছিঁড়ে যায়, ময়লা হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- অন্য পতাকার নিচে রাখা: অন্য কোনো পতাকার নিচে বা ডান পাশে বাংলাদেশের পতাকা রাখা যাবে না। অন্য পতাকার চেয়ে বাংলাদেশের পতাকার অবস্থান সর্বদাই উপরে ও সম্মানের আসনে থাকবে। যদি পাশাপাশি অন্য কোনো দেশ, সংস্থা, গোষ্ঠী বা যেকোনো ধরনের পতাকা টানাতে হয়, তাহলে জাতীয় পতাকার প্রস্থের সমপরিমাণ নিচে অন্য পতাকা টানাতে হবে। কোনোভাবেই একই দণ্ডে জাতীয় পতাকার সাথে অন্য কোনো পতাকা ব্যবহার করা যাবে না।
- সূর্যাস্তের পর উড়ানো: নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পতাকা উড্ডীয়মান রাখা যায় (বিশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপন বা রাতের উপযুক্ত আলোকসজ্জার ব্যবস্থা ছাড়া রাতে পতাকা ঝুলিয়ে রাখা অবমাননাকর)।
- ভুল নিয়মে অর্ধনমিত করা: শোক দিবসে পতাকা অর্ধনমিত করার নিয়ম হলো প্রথমে সর্বোচ্চ চূড়া পর্যন্ত উঠিয়ে তারপর নির্ধারিত স্থানে নামানো। নামানোর সময়ও আগে শীর্ষে তুলে তারপর পুরোপুরি নামাতে হয়।
৫. ছেঁড়া, বিবর্ণ বা ভুল মাপের পতাকা ব্যবহার
- ছেঁড়া, ময়লা, বিবর্ণ বা ভুল অনুপাত ও রঙের (১০:৬ বা ৫:৩ অনুপাত না মেনে তৈরি) পতাকা প্রদর্শন বা ব্যবহার করা অবমাননাকর।
- অবশিষ্টাংশ বা অপ্রয়োজনীয় জরাজীর্ণ পতাকা জনসম্মুখে ডাস্টবিন, রাস্তা বা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দেওয়া অবমাননা।
৬. অনধিকৃত ব্যক্তি কর্তৃক গাড়িতে ব্যবহার
আইনানুযায়ী নির্দিষ্ট উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ (যেমন: রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী প্রমুখ) ছাড়া অন্য কেউ নিজেদের ব্যক্তিগত বা সরকারি গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন না।
কেন অবমাননামুক্ত সম্মান প্রদর্শন জরুরি?
আমাদের অবহেলা বা অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় পুরোনো ও ছেঁড়া পতাকা গৃহস্থালির বর্জ্যের সাথে বা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধের পাশাপাশি জাতীয় চেতনারও পরিপন্থী। জাতীয় পতাকাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব। যখন একটি পতাকা তার ব্যবহারযোগ্যতা হারায়, তখন তা মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে সরিয়ে ফেলা বা বিনাশ করাই পতাকার প্রতি চূড়ান্ত শ্রদ্ধা নিবেদন।
পতাকা অবসরের পূর্বে করণীয়
১. পরিদর্শন: পতাকাটি সত্যিই ব্যবহার অনুপযোগী কি না তা পরখ করুন। যদি সামান্য ময়লা হয় তবে তা যথাযথ নিয়মে ধুয়ে শুকিয়ে আবার ব্যবহার করা যেতে পারে।
২. বাছাই: পতাকাদণ্ড, দড়ি, রিং বা মেটাল ক্লিপ থাকলে তা সতর্কতার সাথে খুলে ফেলুন।
৩. পুনর্ব্যবহার বা সংরক্ষণ (যদি সম্ভব হয়): কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ পতাকা (যেমন: বিশেষ কোনো অর্জনে উড্ডীত পতাকা) জীর্ণ হলেও তা ধ্বংস না করে কাচের ফ্রেমে বাঁধাই করে জাদুঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্মৃতি সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
আইন অনুযায়ী ব্যবহার অনুপযোগী পতাকার বিনাশ পদ্ধতি
'বাংলাদেশ ফ্ল্যাগ রুলস, ১৯৭২' অনুযায়ী, যখন কোনো জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অনুপযোগী বা জীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন তা প্রকাশ্যে কিংবা অবহেলায় ফেলা যাবে না। আইন অনুযায়ী এর সম্মানিত অবসরের প্রধান উপায় হলো:
১. গোপনীয়ভাবে দাহ করা (নিয়ন্ত্রিত ও মর্যাদাপূর্ণ দহন)
ব্যবহার অনুপযোগী পতাকা ধ্বংস করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সম্মাজনক পদ্ধতি হলো তা একান্তে এবং গোপনে পুড়িয়ে ফেলা (Burnt in private)।
- পতাকাটি প্রথমে নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরভাবে ভাঁজ করুন।
- এমন একটি স্থান নির্বাচন করুন যা জনসাধারণের নজরের আড়ালে এবং নিরাপদ।
- আগুন জ্বালিয়ে সম্পূর্ণ সম্মানের সাথে ও নীরবে পতাকাটি আগুনে অর্পণ করুন।
- নিশ্চিত করুন যেন পুরো পতাকাটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয় এবং ছাইটুকু বাতাসে ছড়িয়ে না পড়ে মর্যাদার সাথে মাটিতে চাপা দেওয়া হয়।
- প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই কোনো আনন্দ-উৎসব বা তামাশার অংশ হবে না; এটি হতে হবে একটি গম্ভীর ও সম্মানজনক কাজ।
২. মাটিতে সমাহিত করা (গোপন ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ)
যদিও দহনই প্রধান উপায়, তবে কাপড়ের উপাদানের কারণে (যেমন: সিন্থেটিক বা নাইলন) আগুন জ্বালানো সমস্যাযুক্ত হলে পতাকাটি সম্মানের সাথে মাটিচাপা দেওয়া যেতে পারে।
- একটি পরিষ্কার কাঠের বাক্সে ভাঁজ করা পতাকাটি রাখুন।
- নির্জন ও পরিচ্ছন্ন কোনো স্থানে গর্ত খুঁড়ে বাক্সটি মাটিতে পুঁতে দিন।
- উক্ত স্থানের পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা বজায় রাখুন।
আমাদের যা অবশ্যই বর্জন করা উচিত
- ডাস্টবিন বা সাধারণ ময়লার ভাগাড়ে পতাকা ফেলা।
- রোদ-বৃষ্টিতে ছিঁড়ে ঝুলতে থাকা অবস্থায় ভবনে পতাকা রেখে দেওয়া।
- ছেঁড়া পতাকা দিয়ে অন্য কোনো জিনিস মোড়ানো বা পরিষ্কারের কাজে ন্যাকড়া হিসেবে ব্যবহার করা।
- প্রকাশ্যে জনসমক্ষে মেঝতে ফেলে আগুনে পোড়ানো (যা প্রতিবাদের মতো দেখায়, যা জাতীয় পতাকার চরম অবমাননা)।
জাতীয় পতাকা কেবল এক টুকরো কাপড় নয়, এটি আমাদের জাতীয় সত্তার রূপকার। পতাকাকে উড্ডীন রাখার যেমন নিয়ম রয়েছে, তেমনি জীর্ণ পতাকাকে সসম্মানে বিদায় জানানোর মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃত দেশপ্রেম। সঠিক নিয়মে পতাকার অবসর নিশ্চিত করে আসুন আমরা আমাদের জাতীয় পতাকার মর্যাদা সবসময় অক্ষুণ্ণ রাখি।
DR
1
0
1
1
0
0
0
মন্তব্য (0)