আসামের বাঙালি মুসলমানদের লড়াই মূলত বাংলাদেশের লড়াই: নাহিদ

অক্টোবর 26, 2026 - 12:58
Updated: 2 দিন পূর্বে
0
আসামের বাঙালি মুসলমানদের লড়াই মূলত বাংলাদেশের লড়াই: নাহিদ
ফাইল ফটো

আসামের বাঙালি মুসলমানদের লড়াইকে বাংলাদেশের লড়াই বলে মনে করেন এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। রোববার (২৫ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন। 

পোস্টে নাহিদ বলেন, “১০০ বছর আগে আসামের নগাঁওতে একটি ‘লাইন’ টানা হয়েছিল। বাঙালি মুসলমান কৃষকরা কোথায় থাকতে পারবে আর কোথায় পারবে না, তা নির্ধারণ করার জন্য। আজ ১০০ বছর পর সেই নগাঁওতেই আবার বুলডোজার চলছে। শাসক বদলেছে, ভাষা বদলেছে, কিন্তু আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু একই রয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, ‘গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মাত্র দুই দিনে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ১ হাজার ১০০-রও বেশি বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ১০টিরও বেশি মসজিদ। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অন্তত ৩৩টি অভিযানে ২২ হাজারের বেশি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। সরকারের বুলডোজার বারবার ঘুরেফিরে একই সম্প্রদায়ের দরজাতেই কেন গিয়ে থামে?’

নাহিদ বলেন, “হিমন্ত বিশ্ব শর্মার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে এর উত্তর স্পষ্ট। আসামের ঐতিহাসিক বিতর্ক ছিল ‘অসমীয়া বনাম বাঙালি’র। কিন্তু আজ সেই জাতিগত রাজনীতিকে বিজেপি তাদের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ফ্রেমে আটকে ফেলেছে, যার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বাংলাভাষী মুসলমান।”

তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদের এই প্যাটার্নটা গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া হাজার হাজার মানুষের নাম হুট করে ভোটার তালিকা থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। ১৮ বছরের বেশি বয়স্কদের জন্য নতুন আধার কার্ড বন্ধ করা হয়েছে, তবে সেখানে অনেককে ছাড় দেওয়া হলেও, কোনো ছাড় নেই কেবল বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য।’

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ মানুষ, আর সিএএ এনে অমুসলিমদের জন্য নাগরিকত্বের পথ খোলা রাখা হয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে অবৈধ ‘পুশব্যাক’। ট্রাইব্যুনালকে পাস কাটিয়ে জেলা প্রশাসকদের হাতে বিতাড়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, “খোদ মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, রাতে বিজিবির টহল যেখানে থাকে না, সীমান্ত দিয়ে সেখান দিয়েই মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আসাম আসলে হিন্দুত্ববাদের একটি ল্যাবরেটরি। পুরো ভারত জুড়েই আজ বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। শত বছর ধরে বংশ পরক্রমায় বসবাস করেও শুধু বাংলাভাষী মুসলমান হওয়ায় নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।”

নাহিদ বলেন, ‘আসামের করিমগঞ্জের গল্পটি আমাদের আরও বেশি আপন ও নাড়ির টানের। ১৮৭৪ সালে করিমগঞ্জসহ সিলেটকে বাংলা থেকে কেটে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে মানুষ তখনই ভাইসরয়ের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের গণভোটে ৫৭ শতাংশ ভোটে সিলেট পূর্ববঙ্গে যুক্ত হলেও করিমগঞ্জসহ কিছু অংশ আসামে থেকে যায়। ফলে সিলেটের মানুষের কাছে বরাক আর আসাম কোনো বিদেশের খবর নয়, বরং তা আত্মীয়ের খবর।’

তিনি আরও বলেন, ‘এনআরসি’র বড় ধাক্কাগুলো বরাকের যে তিন জেলায় পড়েছে, তার একটি করিমগঞ্জ, যা একসময় সিলেট জেলারই অংশ ছিল। সুরমার এপারে যে কান্না, ওপারেও সেই কান্না। বাংলা ভাষা আন্দোলনও কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না; ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার দাবিতে পুলিশের গুলিতে ১১ জন বাঙালি শহিদ হন এবং পরে ১৯৭২ ও ১৯৮৬ সালেও রক্ত ঝরেছে।’

নাহিদ বলেন, “তাদের রক্তের বিনিময়েই বরাক উপত্যকায় বাংলা দাফতরিক মর্যাদা পেয়েছে। শিলচরের শহিদদের বড় অংশই বাঙ্গালি হিন্দু পরিবারের সন্তান হওয়ায় এটি প্রমাণ করে যে, ভাষার প্রশ্নে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল, আর তাই বরাকের ভাষা শহিদরাও আমাদের যৌথ উত্তরাধিকার। অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালি মুসলমানের ত্যাগ ছিল আরও নীরব ও ভিন্ন রকমের। টিকে থাকার জন্য তারা নিজেদের মাতৃভাষা ছেড়ে অসমীয়া ভাষা ও আন্দোলনকে গ্রহণ করেছিলেন, যাতে আসাম তাদের আপন করে নেয়। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। আজও তাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয় এবং ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়।”

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আসামে এই বাঙালি মুসলমানদের ওপর এখন দুদিক থেকে আঘাত আসছে, যেখানে বাঙালি হিসেবে মারছে অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদ আর মুসলমান হিসেবে মারছে উগ্র হিন্দুত্ববাদ। বর্তমানে এই দুই ধারা এক হয়ে বাঙালি মুসলমানকে কোণঠাসা করে ফেলছে, যার প্রমাণ মিলছে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়।’

তিনি বলেন, “এই প্রেক্ষাপটে মওলানা ভাসানীর সংগ্রাম অনুসরণীয় ও ঐতিহাসিক। আজ থেকে এক শতাব্দী আগে আসামের এই চরাঞ্চলের শোষিত মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়েছিলেন মাওলানা ভাসানী। ১৯২৪ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভাসান চরে কৃষক সমাবেশের পরেই তিনি ‘ভাসানী’ নামে পরিচিত হন।”

নাহিদ বলেন, “আসামের মাটিতে বাঙালি মুসলমানকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদাও’ রাজনীতির বিরুদ্ধে ভাসানীর আন্দোলন ছিল এই জনগোষ্ঠীর নাগরিক মর্যাদা রক্ষার প্রধান ভিত্তি। ৮ বার কারাবরণ এবং আসাম থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের মূল্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, এই অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানের অস্তিত্ব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং তা রক্ত ও ঘামে অর্জিত এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা।”

তিনি বলেন, ‘আজ আসামের নগাঁও ও চরাঞ্চলে যে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা কেবল কিছু পরিবারের ওপর হামলা নয়। এটি আসাম ও সীমান্ত এলাকায় বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক জাতিগত উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলারই ষড়যন্ত্র। এই সংকট নিরসনে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও ঐতিহাসিক সত্যকে সামনে রেখে আমাদের শক্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। আসামের বাঙালি মুসলমানরা সে দেশেরই অধিবাসী ও নাগরিক, ভারতের সংবিধানের ভেতরেই তাদের আইনি মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের চাওয়া স্পষ্ট। ইতিহাসের স্বীকৃতি এবং একটি ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা।’

তিনি বলেন, “তবে বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল পাশের দেশের খবর নয়; এটি সরাসরি আমাদের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যাদের ওপারে ‘রাষ্ট্রহীন’ করে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তারা দুটি দেশের মাঝখানে আটকা পড়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়ছেন।”

নাহিদ বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিজিবি সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে এবং ভারতকে বেশ কিছু চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে কী এই বুলডোজার থামানো সম্ভব? নগাঁওয়ের উচ্ছেদ নিয়ে দৃঢ় ও স্পষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় কূটনৈতিক অবস্থান এখনো দৃশ্যমান নয়। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কী কেবল সীমান্তে পাহারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?”

এনসিপি নেতা বলেন, ‘সীমান্তে পুশইন ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি সরকারের উচিত একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রহীনতার এই অমানবিক ঝুঁকি নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। কোনো পুশইন বা প্রত্যাবাসন মেনে না নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে হবে সরকারকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে আসামের পরিস্থিতির জের ধরে বাংলাদেশে যেন কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে; কারণ সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা উল্টো আসামের বাঙালি মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের পথকেই প্রশস্ত করবে। বাংলাদেশ যে আলাদা, সেই প্রকৃত সত্য সামনে রাখতে হবে।’

নাহিদ বলেন, ‘১২০ বছর আগে ঢাকা থেকে যে বাঙালি মুসলমানের ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, ব্রহ্মপুত্রের চর থেকে শিলচরের রেলস্টেশন পেরিয়ে আজও তা অসমাপ্ত রয়ে গেছে। সেই ইতিহাস ও স্বজাতির লড়াইকে ধারণ করে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখাই আজ আমাদের প্রধান দায়িত্ব।’

FB/SA/DR

ভালো 0
Dislike 0
ভালোবাসা 0
হাস্যকর 0
ওয়াও 0
দুঃখিত 0
ক্ষুব্ধ 0

মন্তব্য (0)

User