ক্ষমতার পালাবদলে বেড়েছে সহিংসতা: ব্রিটিশ প্রতিবেদন

অক্টোবর 18, 2026 - 13:23
Updated: 6 দিন পূর্বে
0
ক্ষমতার পালাবদলে বেড়েছে সহিংসতা: ব্রিটিশ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্র রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুবাদে আরও প্রসারিত হয়েছে এবং মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি দুর্নীতি, মাঠপর্যায়ে জবরদখল, পুলিশের জবাবদিহির অভাব এবং বিচার বিভাগের ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের ফলে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

গত ১৪ অক্টোবর বুধবার যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি এর উন্নতিও ঘটেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর থেকে রাজনৈতিক কর্মী, সংবাদকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তারপরও দুর্নীতি রোধ করা, পুলিশি জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংস্কার কাজের মন্থর গতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন টিকে আছে। এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করার জন্য যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিনজন প্রতিনিধি বিগত ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ঢাকা সফর করেছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তারা মোট ১৫টি বৈঠকে ২৪ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। ওই সব ব্যক্তিদের তালিকায় রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা, সংবাদকর্মী, গবেষক এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রতিবেদনে অবশ্য পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে সাক্ষাৎকারে উঠে আসা মতামতগুলো পুরোপুরি যুক্তরাজ্যের সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন বা সমর্থিত কোনো নীতি নয়।

প্রতিবেদনটিতে তথ্যের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু সাক্ষাৎকারগুলো কেবল ঢাকাভিত্তিক সফরের সময় নেওয়া হয়েছিল, তাই দেশের প্রতিটি জেলার অবস্থা অভিন্ন এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। এতে রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় সংশ্লিষ্টতা, আইনি মামলা এবং নিরাপত্তা নিয়ে একেক জনের একেক রকম অভিজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে। এই কারণে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীদের কথার সাথে যাচাইকৃত তথ্য ও ব্যক্তিগত মূল্যায়নের মধ্যে ফারাক রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ নানা রাজনৈতিক দল এখন বাধাহীনভাবে সভা-সমাবেশ করার পাশাপাশি সরকারের সমালোচনাও করতে পারছে। যারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাদের মতে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় বেশ কম সহিংস ছিল এবং নির্বাচনের পর হানাহানিও হ্রাস পেয়েছে। তবুও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, জমি ও ব্যবসা দখল এবং সম্পদ কুক্ষিগত করাকে কেন্দ্র করে মারামারি থেমে নেই। তাছাড়া কয়েকটি সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে।

সাংবাদিক আয়েশা কবিরের কথা থেকে জানা যায় যে আগের প্রশাসনের সময়ে গণমাধ্যম কতটা নিয়ন্ত্রিত ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও তিনি বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এখন সংবাদ প্রকাশ করা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। কিন্তু বাকি সাক্ষাৎকারদাতারা ভিন্ন কথা বলেছেন। তারা গণপিটুনি, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য হলো, রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে সবার অভিযোগই নেওয়া হয়। প্রতিবেদনটিতে আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গটি রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিগত আমলের নির্যাতন এবং জুলাই মাসের বিভিন্ন ঘটনার কারণে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। যারা সহিংসতা বা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এমন অনেক সাধারণ সমর্থক নিজ এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই বসবাস করছেন। তবে খোলাখুলিভাবে দলটির পক্ষে দাঁড়ালে হেনস্তা বা আক্রমণের শিকার হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। এই বাস্তবতায় অনেকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলেছেন, কেউ অন্য কোথাও চলে গেছেন, আবার কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা বানোয়াট অভিযোগে দায়ের করা ২১ হাজারের বেশি মামলা তুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন বহু বন্দি। 

অন্যদিকে জুলাইয়ের সহিংসতা এবং অতীতের অন্যান্য অভিযোগে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর বিচার প্রক্রিয়া চলছে। কেউ কেউ জামিন পেলেও অনেকেই এখনও কারাবন্দি আছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সবাইকে অপরাধী দাগিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাক্ষাৎকারদাতারা। একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে নতুন প্রশাসনের আমলেও হয়তো পুরনো অনিয়মগুলোই নতুন কায়দায় ফিরে আসছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কি সত্যিই কোনো রূপান্তর ঘটেছে, নাকি শুধু ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

এছাড়া পুলিশ বাহিনী সংস্কার এবং স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি রয়েছে, সে বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনটি মূলত ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। তাই অক্টোবরের প্রতিটি ঘটনার সরাসরি মূল্যায়ন হিসেবে একে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবুও প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে, ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসলেও সবার জন্য ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কাজটি এখনও বেশ কঠিন রয়ে গেছে।

AS/DR

ভালো 0
Dislike 0
ভালোবাসা 0
হাস্যকর 0
ওয়াও 0
দুঃখিত 0
ক্ষুব্ধ 0

মন্তব্য (0)

User